বরিশালের লঞ্চ থেকে ঢাকার মাটিতে পা দিতে না দিতেই চেকিংয়ের খপ্পরে পড়লো মতি মিয়া। ঢাকায় আজ কী জানি একটা দুর্ঘটনা ঘটছে। শহরের মোড়ে মোড়ে তাই চেক পোস্ট।
মতি মিয়া এসবের কিচ্ছু জানে না। জীবনে এই প্রথম সে ঢাকার মাটিতে পাড়া দিলো! কিন্তু এই পাড়াটাই মনে হয় বিরাট একটা ফাঁড়া হয়ে গেল তার জীবনে!
মতি মিয়া চেক পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাঁধে ছোট্ট একটা কাপড়ের পুটলি। হাতে দুইটা রাতা মোরগ। চেকার সাহেবরা বলছে, চেকিং না করে একটা মশা মাছিও আজ যেতে পারবে না। বড় সাহেবের নাকি সেরকমই হুকুম।
আধ ঘন্টা পর মতি মিয়ার ডাক পড়লো।
‘নাম কী?’
‘মতি মিয়া?’
‘বাড়ি কই?’
‘জি বরিশাল!’
‘এই খানে কী কাম?’
‘মেয়ের বাসায় আসছি!’
‘মেয়ের বাসা কই?’
‘বাড্ডা!’
‘হাতে ওইটা কী?’
‘রাতা মোরগ স্যার! মেয়ের জন্য আনছি! ওর মা’য় দিছে!’
‘ঘরে পালা রাতা মোরগ নাকি?’
‘জি স্যার।’
‘দেহি ওজন কত?’
মতি মিয়ার হাত থেকে মোরগ দুটো ওজন করে চেকার সাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠে।
‘ওজন তো মাশাল্লাহ!’
‘জি স্যার! পাঁচ কেজির বেশি হইবো!’
‘কাপড়ের পুটলিতে কী?’
‘দুইটা লুঙ্গি আর একটা শার্ট!’
‘দেহি!’
এক ঘণ্টা ধরে মতি মিয়ার কাপড়ের পুটলি চেক করা হলো। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না! চেকার সাহেবকে খুব হতাশ মনে হচ্ছে। তিনি ধারণা করেছিলেন মতি মিয়ার এই ছোট্ট কাপড়ের পুটলিতে বিমান বিধ্বংসী একটা রকেট ল্যাঞ্চার থাকবে! কিন্তু তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মতি মিয়া তাই ছাড়াও পাচ্ছেন না।
আশে পাশে বেশ কিছু মানুষজন জমে গেছে। চেকার সাহেবরা এখন সেই সব মানুষ তাড়াতে ব্যস্ত। মানুষজনের চোখে মুখে কৌতুহল! সবাই ভাবছে মতি মিয়া বেশ ঘাগু কোন মাল হবে! এবার পড়ছে ধরা। বুঝবে মজা! মজা দেখার জন্য সবাই তাই নিজ নিজ কাজ ভুলে চেক পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে!
মতি মিয়া এবার মিনমিন করে যাওয়ার অনুমতি চাইলো।
‘স্যার কিছুই তো পাওয়া গেল না! আমি এবার যাই?’
চেকার সাহেব ধমকে উঠলেন।
‘তোর সাহস তো কম না! যাওয়ার নাম করিস! আমরা বলা ছাড়া এখান থেকে এক সেন্টিমিটারও নড়তে পারবি না! বড় সাহেব আসতেছে। তোর চেকিং হবে আবার!’
এদিকে মানুষের ভিড়ের মধ্যে দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে চেক পোস্ট পার হয়ে গেল জব্বার! কেউ কিচ্ছুটি টের পেলনা। পার হতে হতে মতি মিয়াকে আটকে থাকতে দেখে জব্বার মুখ টিপে হাসে। জমে থাকা মানুষজনও মতি মিয়াকে দেখে মুখ টিপে হাসে। এখন চেকার সাহেবরাও মুখ টিপে হাসছেন।
রাত দশটা। বড় সাহেব এসেছেন। মতি মিয়ার ছোট্ট কাপড়ের পুটলি এই নিয়ে তিন দফা চেকিং হচ্ছে। কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না! বড় সাহেবকে বড় রকমের হতাশ লাগছে! তিনি ভেবেছিলেন, মতি মিয়ার এই ছোট্ট কাপড়ের পুটলি থেকে সাবমেরিন বিধ্বংসী একটা টর্পেডো বের হবে!
পুটলিটা অনেক ঘাটা ঘাটির পর রাত ১২টার কিছু আগে বড় সাহেব বুঝেতে পারলেন যে, মতি মিয়া আসলে নির্দোষ! তাকে ছেড়ে দেয়া যায়!
অতঃপর মতি মিয়া চেক পোস্ট থেকে ছাড়া পেল। কিন্তু তার ঘরে পালা রাতা মোরগ দুইটা ছাড়া পেল না! বড় সাহেবের নাকি বড় রকমের সন্দেহ হয়েছে, রাতা মোরগ দুইটা বিশ্ব খ্যাত সন্ত্রাসী সংস্থা’র সদস্য হতে পারে! রাতে নাকি রাতা মোরগ দুইটারে কড়া জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে রাখা হবে! রাতা মোরগ দুইটা যদি এর মধ্যে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে, তাহলে কাল ভোরে ছাড়া পাবে! বড় সাহেবের এককথা!
মতি মিয়া সেই ভোরের অপেক্ষায় চেক পোস্টের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে রইলো। তার হাতে কোন ঘড়ি নেই। ভোর কখন হবে সে জানে না। মতি মিয়ার মত আমরাও আজ বসে আছি একটা ভোরের অপেক্ষায়। আমাদের হাতেও কোন ঘড়ি নেই। মতি মিয়ার মত আমরাও জানি না, রাতের এই অন্ধকার পেরিয়ে আলো ঝলমলে ভোরটা কখন আসবে!