পদ্মাবতী কিংবা পদ্মাবত এর ট্রেলার রিলিজ হওয়ার পর থেকে ইন্ডিয়ার মানুষ যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছে তাতে মনে হচ্ছে কাল্পনিক চরিত্রটিকে বাস্তবতা দিয়েই ছাড়বে। এমনকি এই কাল্পনিক চরিত্রের জন্য এই পর্যন্ত বেশ কয়েক জনের জীবন পর্যন্ত চলে গিয়েছে এবং বড় অংকের সম্পদ বিনষ্ট করা হয়েছে।
রানী পদ্মাবতী এবং আলাউদ্দিন খিলজি নিয়েই এই লেখা, যাকে আমি তিনটি ভাগে ভাগ করেছি। প্রথম ভাগ- আলাউদ্দিন খিলজীর জীবনী, দ্বিতীয় ভাগ- মুভিতে আলাউদ্দিন খিলজির চরিত্রায়ন এবং তৃতীয় ভাগ- রানী পদ্মাবতীর অস্তিত্ব।

কে এই আলাউদ্দিন খিলজী?
১২৯৬ সালে আলাউদ্দিন খিলজী দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। বস্তুত ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রথম পথ প্রদর্শনই আলাউদ্দিন খিলজীর সর্বপ্রধান কীর্তি। তার সাম্রাজ্য বিস্তারনীতিকে উত্তর ভারত ও দাক্ষিণাত্য এই দুভাগে ভাগ করা যায়। ১২৯৭ সালে গুজরাট, ১৩০১ সালে রণথম্ভোর, ১৩০৩ সালে চিতোর এবং ১৩০৫ সালে মালব বিজয় করেন আলাউদ্দিন খিলজী। লিখাতে আমি অমুসলিম বিশেষ করে হিন্দু গবেষকদের কথাকে প্রাধান্য দিয়েছি যাতে করে কেউ যেন বলতে না পারে যে, মুসলমান গবেষকরা তো খিলজির পক্ষে কথা বলবেই।
আলাউদ্দিন খিলজির শাসন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল মোটামুটি এইরূপঃ তিনি সামরিক বিভাগের সংস্কার সাধন করে সৈন্যদের বেতন নির্ধারণ করেন, জিনিসপত্রের দর বেধে দেন, মদ্যপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানের খবরাখবর আনয়নের জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করেন, আমীর ওমরাহদের মধ্যে বৈবাহিক সম্বন্ধ সুলতানের অনুমতি ব্যতিত নিষিদ্ধ করেন ইত্যাদি। মুঘল কুলগৌরব রবি আলমগীরের (আওরাংগাজেব) কথা বাদ দিলে তাঁর পূর্বে কোন মুসলমান এত বড় বিশাল রাজ্যের শাসক ছিলেন না (এই উপমহাদেশে)।

তাঁর ব্যক্তিগত চারিত্রিক কলঙ্কের কথা ব্যতিরেকে শাসনগত যোগ্যতা ও কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ধর্ম সম্বন্ধে বেপরোয়া মনোভাব, স্বার্থপরতা, পাপপ্রবণতা, কূটনীতির নামে প্রতারণার সূক্ষ কৌশল তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রকে মসিলিপ্ত করেছিল। বলাবাহুল্য, আলাউদ্দিন খিলজীর এরূপ ধর্মদ্রোহীতাই পরবর্তী যুগে তাঁর উত্তারিধিকারীদের অনুপযুক্ততা ও মালিক কাফুরের ক্ষমতা লাভের ফলে খিলজি বংশের পতনের অন্যতম কারণ। (সোর্স: ১৩)
তবে ডাঃ ঈশ্বরী প্রসাদ লিখেছেন, ‘আলাউদ্দিন হিন্দুদের অত্যাচার-উৎপীড়ন করেছিলেন বলে যে তথ্যটি প্রচারিত তা সত্য নয়।’ (সোর্স: ০১)। মুরল্যান্ড এবং প্রফেসর হাবীব লিখেছেন, ‘রাবণী যেখানে ‘হিন্দু’ শব্দ ব্যবহার করেছেন তাঁর উদ্দেশ্য হল যুত, মুকাদদাম, চৌধুরী ইত্যাদি। এরা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সুতরাং রাজনীতির প্রয়োজনে তাদের শক্তিহীন করার প্রয়োজন ছিল।’ (সোর্স: ২ ও ৩)। অর্থাৎ যুত, মুকাদদাম, চৌধুরীকে এবং হিন্দুদের তিনি ধর্মের কারণে নিধণ করেননি। ডাঃ ত্রিপাঠী লিখেছেন, ‘তিনি মুসলমানদেরও ছাড়েননি; অতএব হিন্দুদের কীভাবে ছাড়া সম্ভব?’ (সোর্স: ৪)।
আলাউদ্দিন খিলজি সম্পর্কে আরেকটি ‘অপবাদ’ দেয়া হয় যে, তিনি সমকামী ছিল। আবার অনেকে বলে থাকে যে তিনি উভয়কামী ছিল। এই তথ্য প্রথম জানা যায় ইতিহাস ঘটনা-পঞ্জী লেখক জিয়াঊদ্দিন বারানীর লেখা ‘তারিখ-ই-ফিরোজশাহী’ তে। জিয়াঊদ্দিন বারানীর লিখার উপর ভিত্তি করে ভারতীয় গবেষক রুথ ভানিতা এবং সেলিম কিদাই মত প্রকাশ করেন যে, আলাউদ্দিন খিলজী উভয়কামী ছিল (সোর্স: ০৫)। কিন্তু আরেকজন ভারতীয় অধ্যাপক-গবেষক-লেখক আব্রাহাম এরালি এই মতকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করেন।

আলাউদ্দিন খিলজীর সমকামী সঙ্গী হিসেবে মালিক কাফুরকে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। প্রথম যুগে মালিক কাফুর ছিলেন একজন হিন্দু বালক যাকে ১২৯৯ সালে গুজরাট বিজয় করার পর দাস হিসেবে নিয়ে আসা হয়। মালিক কাফুর একজন সুদর্শন বালক এবং বিচক্ষণ বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি মুসলমান হন (বা করা হয়) এবং সুলতানের প্রচণ্ড বিশ্বাসভাজন হন। সুলতানের সেনাপতি হিসেবে তিনি সফলভাবে অনেকগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয় লাভ করেন।
আব্রাহাম এরালি ইতিহাস ঘটনা-পঞ্জী লেখক জিয়াঊদ্দিন বারানীর এই তথ্যকে ভুল বলে সাব্বস্ত করে বলেন যে, সম্ভবত একজন অ-তুর্কি এবং হিন্দু ঘরে জন্ম নেয়ার জন্য জিয়াঊদ্দিন বারানী মালিক কাফুরের বিপক্ষে অত্যন্ত সমালোচনাময় ছিলেন (সোর্স: ০৬)। আরেকজন ভারতীয় ইতিহাসবিদ বেনারসী প্রসাদ সাক্সেনা মত প্রকাশ করেন যে, খিলজি ও মালিক কুফরের মাঝে যে গভীর সম্পর্ক ছিল তাকে সমকাম হিসেবে গণ্য করা ভুল হবে। তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন যে, আলাউদ্দিন খিলজির চরিত্রে সমকামিতার কোন গুণ ছিল না। যেহেতু মালিক কাফুরের পরিবার বা নিকটজন বলে কেউ ছিলো না, তাই আলাউদ্দিন খিলজী তাঁকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই মালিক কুফর আলাউদ্দিন খিলজিকে হত্যা করে এবং পরোক্ষভাবে ক্ষমতা দখল করে (সোর্স: ০৭)।
পদ্মাবতে আলাউদ্দিন খিলজীর চরিত্রায়ন
ঐতিহাসিকরা প্রায় সবাই বলেছেন যে, মুভিতে যেভাবে খিলজিকে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল। সাভেরা আর সোমেশ্বর তার মুভি রিভিউতে বলেন যে, হিন্দু রাজা রতন সিং-কে মুভিতে ভালো হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তাকে প্রায় সব ক্ষেত্রে সাদা-ক্রিম কালারের সুন্দর-মার্জিত পোশাকে দেখানো হয়েছে যেখানে, খিলজিকে একজন নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে দেখানোর জন্য কালো পোষাকে দেখানো হয়েছে এবং আচার-আচরণ ছিলো অনেক বেশি বর্বর এবং অমার্জিত (সোর্স: ৮)।

উত্তরণ দাস গুপ্ত ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ এ লিখা তার প্রবন্ধে বলেন যে, আলাউদ্দিন খিলজিকে মুভিতে যেভাবে পশমের কাপড় ও গোগ্রাসে মাংস খেতে দেখা যায় তাতে তাকে ইন্ডিয়ান খাল দ্রোগো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি আরও বলেন যে, ২০ বছর শাসনকালে মঙ্গলদের আক্রমণ কমপক্ষে ৬ বার সফলভাবে প্রতিরোধকারী এই শাসক ছিলেন তাঁর সময়কার একজন অতীব বুদ্ধিমান ও মার্জিত শাসক (সোর্স: ৯)। ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বলেন যে, মুভিতে খিলজীকে নিষ্ঠুর ও বর্বর হিসেবে দেখানো হয়েছে যাতে করে মুভির নায়ক রানা সিং-কে একজন বিনম্র ও বুদ্ধিমান শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। তিনিও মুভিতে খিলজিকে ভুল ভাবে দেখানো হয়েছে বলে স্বীকার করেন (সোর্স: ১০)।
শান্তানু ডেভিড বলেন যে, খিলজী নিষ্ঠুর হলেও এমন ধরণের শাসক ছিলেন না যে কিনা শুধুমাত্র একজন নারীর জন্য একটি রাজ্য আক্রমণ করে বসবেন (সোর্স: ১১)। অন্যদিকে আন্না এমএম তার মুভি রিভিউতে উল্লেখ করেন যে, হিন্দুদের খুশি করার জন্য বানসালি মুভিতে রাজপুতদের উচ্চাসন এবং খিলজিকে নিচ হিসেবে উপস্থাপন করা করেছেন (সোর্স: ১২)।
রানী পদ্মাবদী: ইতিহাস না মিথ?
রানী পদ্মাবতী নিয়ে কথা বলার আগে রানী কর্ণাবতী নিয়ে কথা বলা যাক। চিতোরের রাজা ‘মহারাজা সংগ্রাম সিং’ এর সাথে তার বিয়ে হয় এবং ফলে চিতোরের রানী হিসেবে গণ্য হন। দিল্লী দখলের লক্ষ্যে মহারাজা সংগ্রাম সিং এর নেতৃত্বে হিন্দুদের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে সম্রাট বাবরের যুদ্ধ হয় ১৫২৭ সালে, যা খানুয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই খানুয়ার যুদ্ধে হিন্দুদের সম্মিলিত বাহিনী পরাজয় বরণ করে এবং মহারাজা সংগ্রাম সিং ভীষণভাবে আহত হন। ১৫২৮ সালে আহত মহারাজা সংগ্রাম সিং মৃত্যু বরণ করেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর, রানী কর্ণাবতী তার বড় ছেলের হয়ে ক্ষমতার ভার নেন এবং বেশ কয়েক বছর রাজ্য পরিচালনা করেন (সোর্স: ১৫)। ১৫৩৫ সালে বাহদুর শাহ মেয়র আক্রমণ করলে রানী কর্ণাবতী ও দূর্গের অন্যান্য নারীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেন এবং বিষ পানে আত্মহত্যা করেন (সোর্স: ১৪)। আবার এটাও প্রচলিত আছে যে, রানী কর্ণাবতী ও দূর্গের অন্যান্য নারীরা বারুদভর্তি কক্ষে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিলেন (সোর্সঃ ১৬)। হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশাহ নামদার’ গ্রন্থে এই ঘটনার ঊল্লেখ আছে।
প্রসঙ্গত, রানী কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রামাধিত্যার সাথে ১৫৩২ সালে বাহাদুর শাহর যুদ্ধ হয় যেখানে বিক্রামাধিত্যা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তাই ১৫৩৫ সালে যখন বাহাদুর শাহর সাথে দ্বিতীয় যুদ্ধে চিতোরের বাহিনী পুনরায় শোচনীয় পরাজয় বরণ করে, তখন রানী কর্ণাবতী ও দূর্গের অন্যান্য নারীরা আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন (সোর্স: ১৭)।

রানী পদ্মাবতীর কথায় আসা যাক আবার। প্রায় সব বিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন যে, সর্বপ্রথম ১৫৪০ সালে মালিক মুহাম্মদ জায়াসির লিখিত পদ্মাবত নামক একটি মহাকাব্যে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। এর পূর্বে ইতিহাসে কোথায়ও তার উল্লেখ পাওয়া যায়নি (সোর্স: ১৮)। আমার ধারণা মালিক মুহাম্মদ জায়াসি রানী কর্ণাবতীর ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে এই মহাকাব্যটি লিখেন। পদ্মাবত মহাকাব্যে বর্ণিত রানী পদ্মাবতীর সাথে রানী কর্ণাবতীর অনেক মিল রয়েছে। যেমন, তাদের দুইজনের স্বামীর রাজ্য ছিল চিতর।
দু’জনের স্বামী যুদ্ধে আহত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। দু’জনই আগুনে (বা রানী কর্ণাবতী বিষ পাণে) আত্নহত্যা করেন। জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক আদিত্য মুখ্যপাধ্যায় বলেন যে, তৎকালীন ইতিহাসে রানী পদ্মাবতীর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তিনি রানী পদ্মাবতীকে মালিক মুহাম্মদ জায়াসির কাল্পনিক সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করেন (সোর্স: ১৯)। আলাউদ্দিন খিলজীর সমকালীন যুগে ২ টি বই প্রকাশিত হয় যার একটি লিখেছেন আমীর খসরু এবং অন্যটি নয়ন চন্দ্র সুরী।
এই দু’জনের লিখা ২ টি বইয়ে রানী পদ্মাবতীর কোন উল্লেখ ছিল না (সোর্স: ১৮)। অধ্যাপক রাম পুনিয়ানি বলেন যে, পদ্মাবত মহাকাব্য পরবর্তীতে ভারতে বহুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং লোককাহিনী হিসেবে মর্যাদা পায়। হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে শতাব্দী পরে মানুষ এই মহাকাব্যকে সত্য হিসেবে বিবেচনা করে এবং রানী পদ্মাবতীকে ‘ঐতিহাসিক চরিত্র’ হিসেবে মনে করতে শুরু করে (সোর্স: ২০)। মুভির ট্রেলার রিলিজের পরে বেশ কয়েক জন ইতিহাসবিদ যাদের মধ্য ইফরান হাবিব, হারবান মুখিয়া, দেবদত্ত উল্লেখযোগ্য পরিষ্কারভাবে মত প্রকাশ করেন যে, রানী পদ্মাবতী একটি কাল্পনিক চরিত্র এবং ছবিটিতে দেখানো ঘটনাবলি অধিকাংশই ফিকশনাল (সোর্স: ২১,২২,২৩)।

শেষ করার সময় বলতে চাই, কাউকে ছোট বা বড় করার উদ্দেশ্য নিয়ে লিখাটি লিখিনি বরং শুধু সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য আমার ক্ষুদ্র এই প্রয়াস।
তথ্যসূত্র:
১. Medieval India, Ishari Prasad, P-208
২. Agrarian system during the Muslim rule in India by more land, P-225
৩. An introduction to the study of medieval India, by Prof: Habib, P-45, Aligarh University Magazine
৪. Some aspects of Muslim administration, by Dr. Tripathi, P-258
৫. R. Vanita; S. Kidwai (2000). Same-Sex Love in India: Readings in Indian Literature
৬. Abraham Eraly (2015). The Age of Wrath: A History of the Delhi Sultanate
৭. Banarsi Prasad Saksena (1992) [1970]. “The Khaljis: Alauddin Khalji”
১৩. ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা
১৪. চেপেরাখা ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা
১৫. Medieval India: From Sultanat to the Mughals Part – II, Satish Chandra
১৬. Encyclopedia of Indian Events & Dates, S. B. Bhattacherje
১৭. Folk Tales of Rajasthan, DINA NATH DUBE