পাক্কা সাড়ে চার বছরের ছোট বোনের হুট করে বিয়ে হয়ে গেছে। ফেসবুকে ‘কাপল গোলস’ লিখে একসাথে হাতের ছবি,পায়ের ছবি পোস্ট করেছে। আমি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে কমেন্ট করলাম, এত শো অফ করার দরকারটা কি তোমাদের? লজ্জা নাই? এই শেখাইছে ফুপা-ফুপু?
বোন রিপ্লাই দিলো, আমি আমাদের দুজনের সুন্দর মূহুর্তগুলো সবাইকে সাক্ষী রেখে টাইমলাইনে রেখে দিতে চাই।
আমি রিপ্লাই দিলাম, কেন? সাক্ষী সাবুদ রেখে বিয়ে করোস নাই? সবাইরে সাক্ষী রাখার কি আছে? এত ঢংয়ের কি আছে শুনি? নাকি তোর বর তোকে ছেড়ে চলে যাবে এই ভয়?
বোন জবাব দিলো, তুমি এসবের কি বুঝবা? প্রেম ভালোবাসার আলাপ আমি কার সাথে করছি! তুমি তো একযুগ ধরে একটা ছেলের পেছনে লেগে থেকে তারে পটাতেও পারো না, হা হা!
ছোটবোনের মুখে এতবড় কথা শুনে আমি কমেন্ট ডিলিট করে দিলাম। মনে বড়ই দুঃখ পাইছি। প্রায় পাঁচ বছরের ছোট বোন বিয়ে করেছে,আবার আমারে খোঁচাও মারছে! সহ্য করা যায়!? আরে,আমি কি তোদের মত আহ্লাদী নাকি? এইসব ঢং আমার অসহ্য!
বোন বেড়াতে এসেছে।আমি দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে আছি। দরজার শিকল ভালো না। বোন এসে কয়েকবার ঝাকুনি দিতেই খুলে গেছে। আমি চোখেমুখে একটা বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে তুলে মুখের ওপর একটা বই ধরে বসে আছি।
বোন এসে আমার পাশে বসল। বললো, আপু,রাগ করেছো?
আমি জবাব দিলাম না।
সে বললো, প্রেম ভালোবাসা জিনিসটা তোমার জীবনে আসা দরকার। ভালোবাসা স্বর্গীয় একটা বিষয়। এই যে তোমার দুলাভাইকে দেখো,আমাকে চোখে হারায়!
আমি মনে মনে ভাবছি, ওরে বাপরে বাপ! এইটুকু পুঁচকের কাছে আমাকে প্রেম বিষয়ক জ্ঞানার্জন করতে হবে? এই দিন আসলো আমার?
মুখে বললাম, তোদের মতো এত ঘর সংসার সামলানো,এইসব আমার দ্বারা হয় না। আমি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীতে জন্মেছি,আমি অনেক বড় কিছু হতে চাই জীবনে, আমি মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই, আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে চাই, আমি দুঃখী মানুষের না বলা চাপা কষ্টগুলো সম্পর্কে লিখতে চাই,লাজুক মানুষের মুখের ভাষা হতে চাই!
এইপর্যায়ে আমার বোন হাসতে হাসতে মেঝেতে বসে পড়ল। কোনপ্রকারে হাসি আটকে বললো, আগে নিজের না বলতে পারা ভালোবাসার কথা ক্রাশকে বলে দেখাও,বারো বছর ধরে একটা ছেলেকে ভালোবাসি বলতে পারলে না সেই তুমি মানুষের ভাষা হবে? হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ
আমি কঠিন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম, ইচ্ছা করছে একটা থাপ্পড় বসাই,তা সম্ভব না। ছোটবেলায় ওরে বহুত চড় থাপ্পড় দিয়েছি,এখন সে কারোর বউ,আমি ওকে থাপ্পড় দেয়ার ক্ষমতা রাখি না। তারবদলে কঠিন গলায় বললাম,তুই আর আমার সামনে আসবি না।
ও নিচু গলায় আবার বললো, আমার একটা দেবর আছে,তুমি চাইলে বিয়ের কথা চালাই?
আরে! সেইদিনের পুঁচকে ও নাকি দেবরের সাথে আমার বিয়ের কথা চালাবে? হচ্ছেটা কি এগুলা!
আমি জবাব দিচ্ছি না দেখে ও আবার বললো, আপু,ঐ ছেলে পটবে না,বহুত তো চেষ্টা করলে, ওকে পটানোর জন্য তুমি আজ পর্যন্ত যত আইডিয়া এপ্লাই করেছো গিনেজ বুকে নাম উঠে যাওয়ার কথা। ভাগ্য খারাপ, ওরা তোমাকে চেনে না।
এইবার আমি উঠলাম। বিছানার পাশে রাখা ঝাঁটার দিকে এগুচ্ছি,তখনই ওর বরের ফোন এলো। ও রিসিভ করে আমাকে শোনানোর উদ্দেশ্যে লাউডে দিলো,
জানপাখি, ময়নাপাখি, আমার বাবু! কই তুমি, কতক্ষন দেখিনা তোমারে, ভিডিও কল দাও!
বোন বললো, একটু আগেই তো এলাম, এরমধ্যে চোখে হারাচ্ছো! আপুর রুমে লাইট কম, দাঁড়াও ছাদে যাই।
ও ছাদে গেল আর আমি সোজা বাড়ি থেকে বের হয়ে রিকশা নিলাম। ও যতক্ষণ বাড়িতে থাকবে আমি রিকশায় করে ঘুরব। ও চলে গেলে ফিরে আসবো।
খানিকটা যাওয়ার পর রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে দেখি রাস্তায় এক মেয়ের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে ইশারা করলো, মেয়েটা দুই আঙ্গুল কানে দিয়ে বোঝালো কল করার কথা, রিকশাওয়ালা মনের খুশীতে দুইদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে এক অটোর সাথে ধাক্কা লাগিয়ে দিলো। অটোওয়ালা বের হয়ে এসে অকথ্য ভাষায় রিকশাওয়ালাকে গালাগালি দিচ্ছে তখন দেখি অটোর ভেতরেও এক কাপল,ছেলেটা মেয়েটার মাথায় হাত দিয়ে সম্ভবত বলছে, ঠিক আছো তো? লাগেনি তো!
আমি রিকশা থেকে নামলাম, সেই ছেলেমেয়ে দুইটাকে টেনে নামালাম। ধমক দিয়ে বললাম, এত ঢং কিসের? এতই যদি মহব্বত অটোয় উঠছিলা কি জন্য? যাও, চোখের সামনে থেকে জুতা খুলে মারলাম কিন্তু, ছেলেমেয়ে দুইটা দৌড় লাগালো।
তারপর থেকে জোড়া জিনিসটা আমার অসহ্য,জোড়া কোন জিনিসই আমার পছন্দ না, এদিকে আমি যেখানেই যাই সেখানেই আমার চোখে শুধু জোড়াই পড়ে,আমাকে যখন মশা কামড়ায় দুইটা মশা একসাথে,সেগুলোকে চটকে ভর্তা করার পর দুইটা জোড়া টিকটিকি চোখের সামনে মারামারি করতে থাকে। খেতে বসে দেখি দুইটা জোড়া ইলিশ রান্না হয়েছে, না খেয়ে উঠে ভাবি পেয়ারা খাই, গাছের কাছে গিয়ে দেখি একটা ডালে দুইটা পেয়ারা জড়াজড়ি করে আটকে আছে। বেলাজ একটা দুনিয়া হইছে, সব জোড়া! ছিঃ